বাজেটের আলোচনায় নজিরবিহীন ঘটনা, নয়া সরকারকে প্রশংসা ও সমালোচনার মিশেলে সর্তক করলেন বিরোধী দলনেতা
On 22 Jun, 2018 At 09:01 AM | Categorized As Main Slideshow | With 0 Comments

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২১ জুন৷৷ নতুন সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আলোচনায় এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী রইলো রাজ্য বিধানসভা৷

বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা মানিক সরকার৷

বিরোধী দলনেতা মানিক সরকারের ভূমিকায় এদিন ট্রেজারি বেঞ্চ এবং বিরোধী বেঞ্চের সদস্যরা রীতিমতো হতবাক হয়ে পড়েছেন৷ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেট নিয়ে আলোচনায় বিরোধী দলনেতা নতুন সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের উচ্চ প্রশংসা করেছেন৷ একই সাথে বাজেটে উল্লেখিত কিছু বিষয় রাজ্যবাসীর মনে নেতিবাচক রেখাপাত করতে পারে, তা নিয়ে নতুন সরকারকে তিনি সতর্ক করেছেন৷ তবে, বুঝিয়ে দিয়েছেন বাজেটের উল্লিখিত কিছু বিষয় নিয়ে আগামী দিনে রাজ্যবাসীর অসন্তোষের ফায়দা লুটবে বিরোধীরা৷ এদিন বাজেটের প্রশংসা ও সমালোচনার মিশেলে বিরোধী দলনেতার বক্তব্য আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতির পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল৷

গত ১৯ জুন রাজ্য বিধানসভায় ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী যীষ্ণু দেববর্মা বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রীর পেশ ব্যয় বরাদ্দের দাবি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে৷ এদিন অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধে আলোচনা শুরু করেন বিরোধী দলনেতা মানিক সরকার৷ সাধারণত বাজেট নিয়ে বিরোধীরা সমালোচনা করেই আলোচনা করেন৷ কিন্তু রাজ্যের বিরোধী দলনেতা মানিক সরকার এদিন আলোচনার সূচনাতেই বাজেটের উচ্চ প্রশংসা করেন৷

মানিক সরকারের কথায়, রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷ শাসক দল নির্বাচনের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে৷ সব প্রতিশ্রুতি প্রথম বারের বাজেটেই প্রতিফলিত হবে এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই৷ কিন্তু বাজেটে নতুন সরকারের দৃষ্টি ভঙ্গি ফঁুটে উঠে৷ এবারের বাজেটেও তাই প্রতিফলিত হয়েছে৷ বিরোধী দলনেতার বক্তব্য, এই বাজেটে কিছু ইতিবাচক বিষয় উঠে এসেছে৷ তাঁর মতে, রাজ্যের দুর্গম এলাকাগুলিতে বিনামূল্যে খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ পাশাপাশি ছাত্রবাসে পাঠরত জনজাতি ছাত্রছাত্রীদের অনুদান বৃদ্ধি করা হয়েছে৷ মানিক সরকারের কথায়, পুলিশে ১০ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করা খুবই দারুণ সিদ্ধান্ত৷ এছাড়াও জেনেরিক মেডিসিনের কাউন্টার বৃদ্ধি, রাজ্যে চারটি শিক্ষক শিক্ষন মহাবিদ্যালয়, এর মধ্যে একটি মহিলাদের জন্য করার রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ৷

তবে, শুধু প্রশংসার মধ্যেই থেমে থাকেননি বিরোধী দলনেতা৷ সমালোচনার সুরে তিনি বাজেটেরকিছু উল্লিখিত বিষয়ের জন্য রাজ্য সরকারকে সতর্কও করেছেন৷ তাঁর কথায়, বাজেট দেখে যতটা তিনি বুঝতে পেরেছেন তাতে দেখা গেছে মূলধনি খরচে বরাদ্দ তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে৷ তাঁর মতে, মূলধনি খরচ বৃদ্ধি করতে পারলে রাজ্যের জন্য সুফল দায়ি হবে৷ সাথে যোগ করেন বাজেটে বেসরকারী সংস্থাগুলির অর্থ দিয়ে উন্নয়ন মূলক প্রকল্প শুরু করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের তিনি বিরোধী নন৷ তবে, এই বিষয়টির উপর নির্ভর করে থাকলেও চলবে না বলে তিনি মনে করেন৷ কারণ বড় কোম্পানিগুলি রাজ্যে আসতে চায়না৷ তাঁর বক্তব্য, অতিতে কেন্দ্র পিপি এবং বিওটি মডেলে কাজের প্রস্তাব করেছিল৷ তখন পূর্বোত্তরের রাজ্যগুলি একযোগে বিরোধীতা করেছে৷ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে তা বোঝানো হয়েছে, যে বেসরকারী পূজিপতিরা মুনাফার বাইরে কিছুই করবে না৷ তাতে রাজ্যের সর্বনাশ হয়ে যাবে৷ মানিক সরকারের দাবি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পূর্বোত্তরের রাজ্যগুলির বক্তব্যের সাথে এক মত হয়েছিলেন৷

এদিন মানিক সরকার কৃষি ক্ষেত্রে বরাদ্দ কম হওয়ায় তা রাজ্যের জন্য সুফলদায়ি হবে না বলে মন্তব্য করেন৷ তাঁর যুক্তি, বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ কম, উপর্যুপরি বন্যার প্রকোপ, গ্রাম ত্রিপুরাকে ভীষণ সমস্যায় ফেলবে৷ মানিক সরকার এর সাথে যোগ করেন, গ্রামোন্নয়নে পূর্বের তুলনায় কম বরাদ্দ যথেষ্ট ভাবনার বিষয়৷ তাঁর কথায়, বাজেট দেখে বোঝা গেছে রেগা প্রকল্পে ব্যয় খাতে প্রাপ্তি সাড়ে তিনশ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে৷ গত আর্থিক বছরের বাজেটে ১১০০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছিল৷ এবছর অর্থ প্রাপ্তির এই দশা হলে তা রাজ্যের জন্য ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে৷ গ্রামে ভীষণ সমস্যা তৈরী হবে৷ মানিক সরকারের কথায়, কেন্দ্রীয় সরকার রেগায় বরাদ্দ কমিয়ে থাকলে তা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায়না৷ এ জন্য তাঁর পরামর্শ, রেগার বরাদ্দ নিয়ে কেন্দ্রের সাথে আলোচনা করা দরকার৷ প্রয়োজনে বিরোধীরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন৷

শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাজেট বরাদ্দ নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন৷ তাঁর কথায়, প্রাথমিক শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ কম তা ঠিক হয়নি৷ যে কোন ছাত্রের গোড়া মজবুত না হলে ভবিষ্যতে সমস্যা হয়৷ কিন্তু দেখা গেছে, বাজেটে প্রাথমিক শিক্ষা এবং উচ্চ শিক্ষায় বরাদ্দ কম রাখা হয়েছে৷ শুধু মাত্র বুনিয়াদি শিক্ষায় বরাদ্দ বেশি রাখা হয়েছে৷ তাঁর মতে, শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দে সর্বক্ষেত্রে সমতা রাখা খুবই প্রয়োজন৷

এদিন তিনি পেট্রোল, ডিজেল এবং গ্যাসের কর বৃদ্ধি ও সেস যুক্ত করায় সাধারণ মানুষের উপর বোঝা চাপানো হয়েছে বলে দাবি করেন৷ তাঁর কথায়, এমনিতেই কেন্দ্রীয় সরকার জ্বালানিতে কর বৃদ্ধি করেছে৷ উপরোন্ত প্রায়শই জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছে৷ এর মাঝে রাজ্যে জ্বালানিতে কর বৃদ্ধি ও সেস যুক্ত করা হলে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের উপর মারাত্মক ভাবে পড়বে৷ কারণ, তাতে জিনিষের মূল্য বৃদ্ধি হবে৷ এই সিদ্ধান্ত গুলি রাজ্যবাসীর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি দাবি করেন৷ তাঁর কথায়, সাধারণ মানুষের উপর বোঝা চাপানো সঠিক হচ্ছে না৷ কারণ, জ্বালানির পাশাপাশি রোড ট্যাক্সও বাড়ানো হবে বলে বাজেটে উল্লেখিত রয়েছে৷ মানিক সরকার মনে করেন, এভাবে সাধারণ মানুষের উপর বোঝা চাপালে তা নতুুন সরকারের জন্য সুখকর হবে না৷ তাই তিনি বাজেট প্রস্তাবে কিছু বিষয় নতুন ভাবে ভাববার পরামর্শ দিয়েছেন৷

এছাড়া ডাল ও তেলের ভর্তুকিতে এপিএলদের বাদ দেওয়া এবং শুধু পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেছেন মানিক সরকার৷ তাঁর মতে, এপিএলদের মধ্যেও অনেকেই রয়েছেন যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়৷ তেমনি গরীবের ঘরের অনেক সন্তানরাই মেধার ভিত্তিতে চাকুরি পাওয়ার যোগ্য নন৷ ফলে, নতুন সরকারের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত গুলি জনমনে হতাশার সৃষ্টি করবে৷ তাই, বাজেটে সকল অংশের মানুষের জন্য সমতা রাখা সম্ভব কিনা তা ভেবে দেখার জন্য বলেন মানিক সরকার৷

এদিন বাজেট প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি মুখ্য সচেতক বিধায়ক কল্যাণী রায় বলেন, নারী ক্ষমতায়ন ও নারী নির্যাতন রোধে এই বাজেট একটা ইতিবাচক দিশা দেখাবে৷ অপরাধ মুক্ত ও নেশা মুক্ত ত্রিপুরা গড়তে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে৷ বিধায়ক সুশান্ত চৌধুরী বলেন, এই বাজেট জনমুখী৷ রাজ্যের ৩৭ লক্ষ মানুষের কাছে এক নতুন দিশা এই বাজেট৷ বিদায়ক শম্ভুলাল চাকমা বলেন, জনজাতিদের উন্নয়নে সরকার বাজেটে যে প্রস্তাব রেখেছে তা প্রশংসনীয়৷ এই বাজেট জনজাতিদের আর্থ-সামাজিক মান উন্নয়নে ও শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে৷

বিধায়ক বীরেন্দ্র কিশোর দেববর্মার কথায়, প্রস্তাবিত বাজেট নজিরবিহীন৷ বাজেটে রাজ্যের উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাই তুলে ধরা হয়েছে৷ রাজ্যে শিল্প কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে তিনি আহ্বান জানান৷ বিধায়ক সিন্ধু কুমার জমাতিয়া প্রস্তাবিত বাজেট সমর্থন করে বলেন, তপশিলী জাতি এবং জনজাতি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বোডিং হাউস স্টাইপেন্ড দিন প্রতি ৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে৷ এটা খুবই আনন্দের৷ বিধায়ক অরুণ কান্তি ভৌমিক বলেন, সব অংশের মানুষের জন্যই এই বাজেট৷ বিধায়ক পিনাকী দাস চৌধুরী বলেন, কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রূপরেখা তৈরী করে দিয়েছেন৷ এই পরিকল্পনা রূপায়ণ করতে প্রস্তাবিত বাজেট এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ৷ আলোচনায় অংশ নেন বিধায়ক বৃষকেতু দেববর্মা ও বিধায়ক সুভাষচন্দ্র দাস৷ আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের বিধায়ক ভানুলাল সাহা এবং রতন ভৌমিক৷

Leave a comment


Powered By JAGARAN – The first daily of Tripura ::: Design & Maintained By CIS SOLUTION