৭০তম বার্ষিকী উদযাপন উৎসব আসছে ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর, স্মৃতির আলোয় কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয়
On 26 Oct, 2018 At 05:28 AM | Categorized As Featured News | With 0 Comments

৷৷পরিতোষ বিশ্বাস৷৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর ক্ষত তখনও শুকিয়ে যায়নি, গোটা দেশজুড়ে স্বাধীনতার উত্তাল হাওয়া৷ অগ্ণিযুগের রেশ রাজন্য শাসিত ত্রিপুরায়ও লাগেনি তেমন নয়৷ ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাষ্ট ভারত দ্বিখন্ডিত স্বাধীনতা পেল৷ আর তখনই টানাটানি চলে রাজন্য শাসিত ত্রিপুরাকে নিয়ে৷ সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রিজেন্ট মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবী ভারতে যোগদানের অঙ্গিকারপত্রে স্বাক্ষর করেন ১৯৪৯ সালে৷ সেই রাজন্য যুগে, ভারতভুক্তির প্রায় এক বছর পূর্বে ১৯৪৮ সালে  আঠারমুড়া ও লংতরাই পাহাড়ের প্রায় পাদদেশে, ধলাই নদীর পাড়ে, মিশ্র বসতির কুলাই গ্রামে স্থাপিত হয়েছিল কুলাই সুকল৷ এখানে উল্লেখযোগ্য যে, লংতরাই পাহাড়ের গর্ভ থেকেই ধলাই নদীর আবির্ভাব৷ কুলাই বাজার থেকে সেই সুউচ্চ লংতরাই পাহাড় দেখা যায়৷ যেন মনে হয় কাল চাদরে ঢাকা পড়ে আছে পাহাড়ের অরণ্য রাশী৷ অনন্তকাল যেন এই একইভাবে লংতরাই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ ধলাই নদীর জন্মদাত্রি লংতরাই এলাকার মানুষের কাছে প্রণম্য, শৈশবের স্মৃতি৷ সেই লংতরাইয়ের ধলাই নদীর পাড়ে কুলাইতে শিক্ষার আলোর সংগ্রাম শুরু হয়৷ দিগন্ত বিস্তৃত কুলাই এলাকা সবুজের সমারোহে, পাহাড়ের হাতছানিতে উদ্বেলিত মানুষ শিক্ষার প্রসারের সংগ্রামে কিভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে তাও এক ইতিহাস৷ প্রাথমিক বা প্রথম শ্রেণী থেকেই কুলাই সুকল যাত্রা শুরু করে৷ সরকারী রেকর্ড এমন কি গুগুল ঘেটে পাওয়া তথ্যেই জানা গেল সুকলের যাবতীয় তথ্য৷ সেই হিসেবেই কুলাই দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয় আজ সত্তর বছরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ৷ রাজন্য যুগে, যখন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে, সেই সময় কুলাইয়ের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে সুকল গড়ে উঠার ঘটনাকে স্মরণীয় ও বরণীয় করার দায় আমরা কী অস্বীকার করতে পারি? ধলাই নদী তখনো আগ্রাসী হয়ে উঠেনি৷ সেই নদী তখন যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করতো৷ কমলপুর থেকে কুলাই নদীপথে পণ্য আনা ও নেওয়া হত৷ শুধু পণ্য নয়, নদীপথে জনপরিবহণের ইতিহাসও আজ আমাদের কাছে বিস্ময় জাগায়৷

পঞ্চাশের দশকে কুলাই বাজার ছিল অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্র৷ নানা প্রান্তের ব্যবসায়ীরা সেখানে হাজির হতেন৷ সেই সময় এই এলাকার আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি ভাল ছিল না৷ ছন বাঁশের ঘরই ছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রে৷ কিন্তু কুলাইতে ছিল বর্ধিষ্ণু বাজার৷ হাটবারের অন্তত দুই দিন আগেই ক্রেতা বিক্রেতারা কুলাইতে হাজির হবার ঘটনাও আছে৷ লংতরাই ও আঠারমুড়া থেকে উপজাতি অংশের মানুষ দল বেঁধে নেমে আসতেন এই বাজারে৷

দারিদ্রের কষাঘাতে নিমজ্জিত ধলাই পাড়ের মানুষ অন্ধকার ভেদ করে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন৷ সুনির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি৷ রাজন্য যুগে কুলাইতে চালু হওয়া এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ই ধাপে ধাপে দ্বাদশ শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে৷ আর এই ধারাবাহিকতার ইতিহাস ও কুলাই দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয় আমাদের কাছে অনেক বেশি গর্বের৷ তৎকালীন কুলাই এলাকার শিক্ষানুরাগী মহল কত বেশী বিচক্ষণ ও শিক্ষাপ্রেমী ছিলেন তার প্রমাণ রাজন্য আমলেই সুকল প্রতিষ্ঠার ইতিহাসই বৃহত্তম নজীর বলে মনে করা যেতে পারে৷ অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণে এই সংগ্রামের গরিমাকে আজ স্মরণ করা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব বলেই মনে করা উচিত৷

ত্রিপুরা ছিল স্বাধীন রাজ্য৷ বৃটিশকে কর দিয়ে রাজত্ব চালাতেন ত্রিপুরার রাজারা৷ তাই এই ত্রিপুরা করদমিত্র রাজ্য হিসেবেও পরিচিত ছিল৷ ১৯৪৯ সালে ত্রিপুরার ভারতভুক্তির পরই শিক্ষার সংগ্রাম আরও তীব্র হয়৷ এলামনি এসোসিয়েশন, কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয় এই শিক্ষার সংগ্রামকে আরো বেশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকা নিতে চাইছে৷ দীর্ঘ ৭০ বছরের ইতিহাসকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এলামনি এসোসিয়েশন কতটা সফল হবে এখনই বলা কঠিন৷ তবে, ৭০তম বার্ষিকী উদযাপনে অগ্রণী হওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাহসিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে৷ কারণ, এবারই প্রথম কুলাই দ্বাদশ সুকলের জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে প্রাক্তন ছাত্ররা যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা অভিনন্দন যোগ্য৷ প্রাথমিক সুকল থেকে দ্বাদশ সুকলে উন্নীত হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেরণা৷ এই গৌরব তখনই মহিমান্বিত হবে যখন সুকলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা নতুন প্রজন্মের সামনে সংহতি, ঐক্য ও শিক্ষার সংগ্রামকে আরো বেশি সক্রিয়  করতে সক্ষম হবেন৷ কুলাই সুকলের গৌরবের ইতিহাস খঁুজে পেতে আমাদের অনেক বেশি চেষ্টা করতে হয়েছে৷ রেকর্ড হারিয়ে গেছে, তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না৷ আগামী দিনে যাতে সুকলের যাবতীয় তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যায় বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম যাতে সুকলের তথ্য ইতিহাস থেকে বঞ্চিত না হয়, এটা যাতে প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে থাকে সেই চেষ্টা করতে হবে৷ সুকলের ৭০তম বছর উদযাপনের সিদ্ধান্তে সুকলের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা অকুন্ঠচিত্তে স্বাগত জানিয়েছেন৷ এই সুকল থেকেই অনেক ছাত্রছাত্রী আজ স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন৷ এই সুকলের বহু ছাত্রছাত্রী ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত হয়েছেন৷ একসময়ের অখ্যাত একটি গ্রাম বিখ্যাত হয়ে উঠার পেছনে একটি বিদ্যালয়ের কত বড় অবদান বা ভূমিকা থাকতে পারে তার বড় প্রমাণ বোধ হয় কুলাই দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়৷ এই সুকলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকেই অনেকে এই সুকলের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন৷ এই গর্বের বোধ হয় তুলনা হয় না৷ সাহিত্য, সংসৃকতি ও রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে একটি অগ্রণি গ্রাম কুলাই৷ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই গ্রাম অনেক বেশি অগ্রসর৷ ত্রিপুরা ভারতভুক্তিতে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গে  ত্রিপুরায় চালু হয় চিফ কমিশনারি শাসন৷ ১৯৫২ সালে সারা দেশের সাথে প্রথম সাধারণ নির্বাচন ত্রিপুরাতেও অনুষ্ঠিত হয়৷ সেদিন গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাস প্রাণ ভরে গ্রহণ করে পাহাড় বনানি ঘেরা ত্রিপুরার মানুষ৷ সেই সময় পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ঢল ত্রিপুরার সামগ্রিক ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটে৷ গণতান্ত্রিক ভারতের সাথে সংযুক্তি হলেও ত্রিপুরা দীর্ঘ সময় ছিল কেন্দ্রের শাসনাধীন৷ চিফ কমিশনারি শাসনের পর ১৯৬৩ সালে ত্রিপুরায় প্রথম বিধানসভার সূচনা হয়৷ গণতন্ত্রের সামান্য অনুভব রাজ্যবাসীর ভাগ্যে জুটে৷ কেন্দ্রীয় শাসনাধীনে রাজ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়৷ কুলাই সুকল উন্নীতকরণের ক্ষেত্রে ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহের বিরাট ভূমিকা ছিল৷ ১৯৬৩ সালে কুলাই সুকলকে উচ্চ বুনিয়াদী স্তর থেকে হাইসুকলে উন্নীত করার জন্য এলাকার অভিভাবকরা মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহের দ্বারস্থ হয়েছিলেন৷ কিন্তু, স্নাতক শিক্ষক না পাওয়ার কারণে সুকল চালু করতে বিলম্ব হয়েছে৷ সেই ১৯৬২ সালের টালমাটাল ঘটনার সাথে শিক্ষার সংগ্রাম স্তব্ধ হয়নি৷ সেই সময় ভারত প্রতিরক্ষায় অনেক বেশি পিছিয়ে ছিল, শুধু প্রতিরক্ষা নয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনগ্রসর, রিক্ত ভারত উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যখন কর্মব্যস্ত তখনই চীন-ভারত যুদ্ধ এক বিড়ম্বনা এনে দিল৷ যে দেশ বিশ্বজুড়ে শান্তির পঞ্চশীল নীতি প্রচারে মগ্ণ ছিল, সেই দেশ আক্রান্ত হয়ে অসহায়ভাবে ছটফট করেছে৷ তখন ব্যয়সংকোচের থাবা থেকে সুকলগুলিও বাদ যায়নি৷ ছিল কাগজ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা৷ অসহায় ভারত সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছিল দেশের আপামর জনগণ৷ নগদ অর্থ সাহায্য ছাড়াও কুলাই এলাকার মহিলারাও নিজেদের স্বর্ণালঙ্কার সরকারের কোষাগারে তুলে দিয়েছিলেন৷ ভগ্ণ অর্থনীতি নিয়ে যে স্বাধীন ভারতের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখানে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ ভারতের চোখ খুলে দিয়েছিল৷ শুরু হয়েছিল নতুন সংগ্রাম৷ দেশ রক্ষার কাজে তখন ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুত হতে আহ্বান জানানো হয়েছিল৷ শুরু হয়েছিল সুকলে সুকলে রাইফেল ট্রেনিং৷ ক্যাম্প করে সেনা জওয়ানরা কুলাই সুকলে ছাত্রছাত্রীদের রাইফেল ট্রেনিং দিয়েছেন৷ মাসব্যাপী ট্রেনিংয়ের পর কুলাই সুকলের পেছনে পাহাড় ঘেরা জঙ্গলে ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীরা রাইফেল চালাতেন৷ প্রয়োজনে ছাত্রছাত্রীদেরও দেশরক্ষার জন্য যুদ্ধে যাবার লক্ষ্যে তারই প্রস্তুতি ছিল৷ এখন আর সুকলে সুকলে ছাত্রছাত্রীদের রাইফেল ট্রেনিং দেওয়া হয় না৷

ছোট ক্লাশেই দেখেছি, ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার বিষয়ে শিক্ষকরা কতখানি যত্নবান ছিলেন৷ প্রতিদিনের পড়া শিখে না গেলে শাস্তি ছিল অনিবার্য্য৷ সুকল ছুটি হয় বিকাল চারটায়৷ কিন্তু পড়া না শিখলে ছুটি দিতেন না শিক্ষক৷ পড়া শিখে রাত আটটায় ছাত্র বা ছাত্রীরা বাড়ী গেছেন৷ শিক্ষক ঠায় বসে পড়া নিয়েছেন৷ প্রয়োজনে বাড়ী পৌঁছে দেবারও ব্যবস্থা করেছেন৷ এমন নজীর কি এখন ভাবা যায়? শুধু তাই নয়, পড়াশুনায় ছাত্রছাত্রীদের গাফিলতি ইত্যাদির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক এমনকি প্রধান শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের বাড়ীতে চলে যেতেন এবং অভিভাবকদের নজরে নিতেন৷ এই অভিজ্ঞতা আমার সুকল জীবনে একাধিকবার হয়েছিল৷ শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক কত নিবিড় ও শ্রদ্ধার হতে পারে তা আজ বোধহয় ভাবাই যায় না৷ শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের অগাধ শ্রদ্ধা ছিল৷ একটি উদাহরণ, কোনও ছাত্র সাইকেল বা রিক্সায় চড়ে যাচ্ছেন তখন রাস্তায় সুকলের কোনও শিক্ষক ওই সড়কে হেঁটে যাচ্ছেন বা আসছেন দেখলেই ছাত্র রাস্তায় নেমে পড়ে শিক্ষককে সম্মান জানাতেন৷ ছাত্ররা যেমন শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করতেন, তেমনি শিক্ষকরাও ছাত্রদের শাসন করতেন, স্নেহ করতেন৷ উজার করে দিতেন জ্ঞান ভান্ডার৷ আগে আজকের মতো এমন প্রাইভেট ট্যুইশানির দৌরাত্ম ছিল না৷ সুকলেই পঠন পাঠন হত৷ পড়া শিখে না গেলে শাস্তির মুখে পড়তে হত৷

জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়ষী৷ কুলাই আমার জন্মভূমি ও শিক্ষাভূমি৷ শৈশব ও কৈশোরের সেই স্মৃতি আজও, এই বার্ধক্যেও চোখে জল আনে, কষ্ট হয়, ফিরে না পাওয়ার কষ্ট৷ আমার মতো যারা তাঁদের অন্তরের টান আলাদা৷ অষ্টম ও নবম শ্রেণী থেকেই সুকলের পঠন পাঠনেই আমি আবদ্ধ থাকতে চাইতাম না৷ সুকলের সাহিত্যসভা, বিতর্কসভা, নাটক ইত্যাদি নানা কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকতাম৷ আমি যখন নবম শ্রেণীতে পাঠরত তখন প্রথম ছাপার অক্ষরে সুকল ম্যাগজিন ‘আন্তর’ প্রকাশ হয়েছিল৷ এই সুকল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলাম আমি৷ সেই ছাপার অক্ষরে প্রথম ‘আন্তর’ এর আত্মপ্রকাশে সেদিন শুধু রোমাঞ্চিত হইনি, উল্লসিত হয়েছি৷ যেন বিরাট কিছু জয় করে ফেলেছি৷ বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাহিত্য প্রতিযোগিতা ও ছাপার অক্ষরে সাহিত্য পত্র ‘আন্তর’ প্রকাশের ঘটনা একটি গ্রামের সুকলে কত বিশাল তা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখে না৷ সুকলের এই সব কর্মকান্ডে জড়িয়ে থাকার অনুভূতিই আমাদেরকে এগিয়ে যাবার শক্তি যুগিয়েছে৷ সুকলে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীতে যেদিন আমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হই তখনই সেই সাধনাতে আরও বেশী মগ্ণ হয়ে পড়ি৷ তারই ফলশ্রুতিতে বোধ হয় আমি ত্রিপুরার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র জাগরণ এর সত্বাধিকারী ও সম্পাদকের মতো গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারছি৷ এই শক্তির উৎস আমার সুকল, এই সুকলই দিয়েছে আমাকে প্রেরণা৷ এই ইতিহাস নিঃসন্দেহে আজকের প্রজন্মের কাছে একটি শিক্ষা হতে পারে৷ এই বিষয়গুলি এই পরিসরে তুলে না ধরলে বোধহয় ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হত৷

সুকল জীবনের স্মৃতি সবটাই এখানে তুলে ধরা হয়তো অসম্ভব৷ অসম্ভব এই কারণে যে, তাহলে কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে৷ তাই অনেক টুকরো টুকরো স্মৃতি যেগুলি হয়তো আজকের যুগে অনেকখানি প্রাসঙ্গিক, সেগুলি তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে৷ শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক কত গভীর হতে পারে তা এখন হয়তো ভাবা যায়না৷ আমার এই কথাগুলো তুলে ধরার বড় কারণ বর্তমানে যে অবক্ষয় শিক্ষাকে কলুষিত করছে তার হাত থেকে মুক্তি পথের সন্ধান হয়ত পাওয়া যেতে পারে৷

সুকলের প্রতি সেই যে টান, তাকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই৷ আর এজন্যই কুলাই সুকলের প্রাক্তনীদের নিয়ে এই সুকলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনের লক্ষ্যে আমি কয়েকবছর আগেই উদ্যোগ নিয়েছিলাম৷ সেই এলাকায় বসবাসরত প্রাক্তন ছাত্র বা নেতার দ্বারস্থও হয়েছিলাম৷ কিন্তু, কাকস্য পরিবেদনা৷ শেষ পর্যন্ত গত অগাষ্ট মাসেই নেমে পড়লাম কুলাইতে৷ চষে বেড়ালাম প্রাক্তন ছাত্রদের বাড়ীঘর৷ যথেষ্ট সাড়া পাওয়া গেল৷ তেরই অগাষ্ট ২০১৮ কুলাই সুকলের প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে বৈঠকে গঠিত হল এলামনি এসোসিয়েশন, কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয় এডহক কমিটি৷ এই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হল আমাকে৷ এরপর গত উনিশ অগাষ্ট আমার সভাপতিত্বে বর্দ্ধিত কলেবরে সাধারণ সভায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়ে গেল৷ এরপর এক সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় আগামী ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয়ের ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করবে এলামনি এসোসিয়েশন৷ চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি৷

কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয় ও এই সুকলের মাঠ ভারতের প্রতিপক্ষ তৎকালীন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আক্রমন শানাতে ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনা বাহিনী ব্যবহার করেছিল৷ পাকিস্তানের শ্রীমঙ্গলে পাক বাহিনীর সেনা ছাউনিতে ভারতীয় বাহিনী আক্রমণ শানাত এই কুলাই সুকল মাঠ থেকেই৷ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ও বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাসে কুলাই সুকল ও সুকল মাঠের অবদান সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করতেই হয়৷

একটি সুকলের সত্তরতম বছর পালনকে কেন্দ্র করে এই এলাকাই শুধু নয়, রাজ্য ও দেশের ক্রম বিবর্তনের ইতিহাসকে স্মরণ করার সুযোগ এনে দেয়৷  সবচাইতে বড় কথা, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে পুনরুদ্ধার করে এক মহামিলন মেলায় সামিল হওয়া৷ অনেক প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী যিনি এখন কর্মজীবনে ব্যতিব্যস্ত আছেন তাঁরা ছুটে আসছেন মাটির টানে, শিকড়ের আকর্ষণে৷ এই শিকড় ও মাটিকে দূরে সরিয়ে দেয়া অসম্ভব৷ দেশের ও বিদেশের মাটিতে কর্মব্যস্ত প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা দুদিনের মহা মিলনে যোগ দেবেন বলে জানা গেছে৷ রাজনীতির ভেদাভেদের উর্ধে উঠে কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয় সত্তর তম বছর উদযাপনে সাফল্য কামনা করছি৷ বলা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, চর্চা ও অনুসন্ধানের অভাবে অনেক ইতিহাস হারিয়ে যায়৷ প্রতিটি সুকলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে অত্র এলাকার ইতিহাস উঠে আসে৷ অনেক অজানা তথ্যে সমৃদ্ধ হবার সুযোগ এনে দেয়৷

Leave a comment


Powered By JAGARAN – The first daily of Tripura ::: Design & Maintained By CIS SOLUTION